তারা বলছেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হতে হবে ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে করহারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ব্যবসার ওপর করহার না বাড়িয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মতো খাতগুলোকে কর জালের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও করের আওতায় আনার পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ কথা বলেন বক্তারা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সভায় আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আর্থিক খাত, শিল্প-বাণিজ্য এবং অবকাঠামো খাত—এ চার বিষয়ে পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সেশনে খাতসংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে বেশকিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন।
ডিসিসিআই তাদের প্রস্তাবে বলেছে, কম কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে সরকারকে ঋণ এবং পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থনীতি এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে গেছে। এতে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা করজালের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে সরকার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে কর ব্যবস্থার অটোমেশন ও সহজীকরণের ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নতুন করদাতা শনাক্তকরণ এবং করজাল সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ডিসিসিআই প্রস্তাব করেছে, ব্যক্তির করমুক্ত আয় সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। পাশাপাশি নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারও লিস্টেড কোম্পানির মতো ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করপোরেট ট্যাক্স রিটার্ন পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সভায় ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মো. কাউসার আলম বলেন, ‘বাজেট ও রাজস্ব নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, দেশ পরিচালনায় সহায়তা এবং নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো। তবে বর্তমান বাজেটে করদাতা, বিশেষ করে ব্যবসায়ী, ব্যক্তি করদাতা ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের টেকসই অংশগ্রহণ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।’
এ সময় ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার সামির সাত্তার বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট কর আহরণের প্রায় ৮০ শতাংশই ঢাকা থেকে আসে, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বড় বৈষম্য নির্দেশ করে।’ এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে একটি সমন্বিত ‘ম্যাপিং প্রোগ্রাম’ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় কী ধরনের ব্যবসা—ফরমাল ও ইনফরমাল চলছে তা শনাক্ত করে সেগুলোকে করজালের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনতে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআইভিত্তিক রিস্ক প্রোফাইলিং চালু করা জরুরি। এতে আমদানি-রফতানিতে মিসডিক্লারেশন ও রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে।’ পাশাপাশি কর আহরণ ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপনে কর সুবিধা দিলে বিনিয়োগ ছড়িয়ে পড়বে।’
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, এবারের বাজেট ব্যবসায়ীদের জন্য খড়গ বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, ‘ফিসকল (অর্থ সম্পর্কিত) শৃঙ্খলা বাড়ানোর জন্য আমাদের করভিত্তি বাড়ানো দরকার। এজন্য আমরা ব্যক্তি পর্যায়ে কর বাড়াচ্ছি না, করভিত্তিটাই বাড়াব। আমার বিশ্বাস, এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয় যে ভিশন নিয়ে কাজ করছে, আগামী বাজেট ও বাজেট-পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব দেখবেন। এটা মনে করবেন না যে, আপনাদের জন্য খড়গ আসছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ ব্যবসা প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি।’
তিনি জানান, সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা ঘরে বসেই লাইসেন্স ও নিবন্ধন সেবা নিতে পারেন।
এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনতে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে বলে জানান। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা যাবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে মন্দা ও চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। সরকার এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে প্রবৃদ্ধিমুখী পথে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে একটি স্বাভাবিক ও উচ্চ বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এর ফলে আমরা একটি সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। এজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে হবে।’
সভায় আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুবর রহমানসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।